চকবাজার অগ্নিকাণ্ড: ঘটনাস্থলে গিয়ে যা দেখা গেল

রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মান্তিক বিবরণ পাওয়া যায় স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে। আগুনের লেলিহান শিখা মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছিল।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত লাশের সংখ্যা ৭০ ছাড়িয়েছে। কাজেই চকবাজারসহ পুরান ঢাকার বাতাস ছিল শোক আর আর্তনাদে ভারী।

ঘটনাস্থলে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, রিকশাভ্যান, রাসায়নিক, দাহ্য পদার্থ, বডি স্প্রে, বোতল, পাউডার, প্লাস্টিকের দানা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ভস্মীভূত হওয়া ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে আরও একটি দুর্ঘটনা।

নিম্নমানের সিলিন্ডার দিয়ে কীভাবে ব্যবসা করার অনুমতি পায় তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন কেউ কেউ। ঘটনাস্থলের কাছে একটি মসজিদ। আশপাশের সব কিছু পুড়ে গেলেও অক্ষত আছে মসজিদটি।

পুড়ে ছাই হয়ে গেছে মুদি দোকান। ছাইয়ের মধ্যে পড়ে আছে নুরানি কায়দা। কালো বর্ণের গোটা গোটা আরবি হরফগুলো ধ্বংসাবশেষের মধ্যে একমাত্র রক্ষা পাওয়া বস্তু।

যে ভবনটি থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, তার কাছের একটি বাড়িতে থাকেন শিল্পী আকতার। তিনি বলেন, রাতে ১টা গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বের হয়েছিলাম। তখন দেখি কালো ধোঁয়ায় সব ছেয়ে গেছে। ক্ষিপ্র আগুন ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।

প্রত্যক্ষদর্শী আনোয়ার বলেন, পাশের কমিউনিটি সেন্টারে গায়েহলুদের অনুষ্ঠান ছিল। একটা গাড়ি সেখানে এসে থামলে সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে ওপরে উঠে যায় সেটি। একেবারে হলিউডের চলচ্চিত্রের গাড়ি ধ্বংসের দৃশ্যের মতো।

মসজিদের পাশেই মদিনা ফার্মেসি। সেখানে ওষুধ কিনতে এসেছিলেন ৪৩ বছর বয়সী আয়শা বেগম। কিন্তু আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেননি। তার ভাইয়ের ছেলে রাতুল বলেন, তিনি রাতের বেলায় ওষুধ কিনতে বের হন। পরে আর তার খোঁজ পাইনি। সকালে খবর পেলাম ৪৮ নম্বর সিরিয়ালে তার মরদেহ। দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে তার।

প্লাস্টিকের দানার ব্যবসায়ী সাবির বলেন, মসজিদের সামনে এখানে দুটি প্রাইভেটকার ছিল, আরেকটা পাউডারের গাড়ি ভুল পাশে দাঁড় করানো ছিল, এসময় একটা রিকশা মসজিদের সামনে যাওয়ার পর সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে।রিকশাতে একটা শিশু ছিল। সবাই মারা গেছেন।

নাছির আহমেদ নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, রিকশায় এক নারী তার সন্তানকে রক্ষার জন্য আকুতি করছিলেন। ইচ্ছা করলে তিনি নিজে বাঁচতে পারতেন। কিন্তু সন্তানকে বুকে নিয়ে মৃত্যুকে বেঁচে নিয়েছেন তিনি।

ছবি: যুগান্তর

হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে চাকরি করেন নাসির। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় বাঁচার জন্য দোকানের সাটার আটকে দিয়েছিলেন ছয় কর্মী। সেখানেই নিহত হয়েছেন তারা।

একইভাবে মদিনা ফার্মেসিতে কাজ করা আট ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তারা ভেবেছিলেন ভেতরে আগুন ঢুকবে না। কিন্তু সাটার পুড়ে ছাই করে আগুন ভেতরে ঢুকে যায়।

ফ্লেক্সিলোডের দোকানে আগুনে পুড়ে মারা গেলেন দুই সহোদর। পাশেই ডেকোরেটরের মালিকসহ আরও ৯ জন নিহত হলেন।

ডেকোরেটরের মালিকের ভাতিজা বিল্লাল বলেন, আমার চাচা ছিলেন দোকানের ভেতর। আগুন লাগার পর সাটার বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে পড়ে আছে চারটি ঠেলাগাড়ি, ২০টির মতো অটোরিকশা, কিছু রিকশা। পুরো ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে রাস্তায় পড়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.